আমার জন্মের আগে দুটো ছেলে জন্মেছিল মা’র। ছেলে জন্মেছিল বলে রক্ষে। তা নইলে বংশের বাতি কে জ্বালাতো! মেয়েরা তো আর বংশের বাতি জ্বালানোর জন্য নয়। মেয়েরা ঘরের শোভা বাড়ানোর জন্য, সংসারের কাজে মা’কে সাহায্য করার জন্য, ঘরদোর সাফ রেখে ঘরের পুরুষের মনোতুষ্টি করার জন্য।
দুটো ছেলে হবার পর বাবা বললেন এবার মেয়ে চাই। ব্যস মেয়ে হল। মেয়ে হল উল্টো। ঠ্যাং আগে, মাথা পরে।
মা’র আঁতুড় ঘর ছিল এঁদো গলির ভেতর খলসে মাছে ভরা পুকুর পাড়ে নানির চৌচালা ঘরের পাশে ছোট্ট একটি চালা ঘর, যে ঘর মা’র জন্য বরাদ্দ হয়েছিল পাঁচশ টাকা দেনমোহরে রজব আলীর সঙ্গে বিয়ের পর। রজব আলী মোক্তার বাড়িতে জায়গির থেকে ডাক্তারি পড়তেন, ঈদুল ওয়ারা বেগমের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর শ্বশুর বাড়িতে উঠেছেন, কথা ছিল পাশ দিয়ে আলাদা বাড়িতে উঠে যাবেন। রজব আলীর পাশ হয়, চাকরি হয়, চালা ঘরেই দুই ছেলে হয়, রজব আলীর বউ পোয়াতি হন আবার, তবু চালা ঘর ছেড়ে কোথাও আর যাওয়া হয় না। পড়শিরা বলে ঈদুনের জামাই দেখি ঘরজামাই হইয়াই রইল। অপমানে মা’র মুখ বেগুনি হয়ে ওঠে। মা স্বামীকে ফাঁক পেলেই বলেন ডাক্তার হইছ, টেকা কামাই কর, বউ পোলাপান লইয়া আলদা থাকার জো নাই? আর কতদিন শ্বশুরের বাড়িত থাকবা? মাইনষে ভালা কয় না।
সরোজিনি ধাত্রী মা’র পেটের ওপর ত্যানা বিছিয়ে তার ওপর আংড়ার হাঁড়ি রেখে সারা পেট বোলান। মা ব্যথায় খামচে ধরেন ধাত্রীর হাত। মা’র হাতে পিয়াঁজের গন্ধ, নখের তলে হলুদ। খাচ্ছিলেন পাকঘরে বসে, খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই ব্যথা ওঠে, থাল ঠেলে পিঁড়ি ডিঙিয়ে চলে এসেছেন শোবার ঘরে, বিছানায় চিৎ হয়ে পড়ে শুরু হয় কাতরানো। নানি তাঁর কাতরানো মেয়ের মাথায় বাতাস করতে করতে বলছিলেন সহ্য কর,সহ্য কর। মেয়ে মাইনষের সহ্যশক্তি না থাকলে চলে না। নানা হনহনিয়ে হেঁটে গেছেন সরোজিনি ধাত্রীকে ডেকে আনতে। তিন মাস আগেও সরোজিনি ধাত্রী এ বাড়ি এসেছেন, নানি যেদিন জন্ম দিলেন ফেলুর। নানি নিঃশব্দে বিয়োন। পাড়া পড়শি কেন, বাড়ির লোকও টের পায় না। ব্যথা উঠলে পাকঘরে পাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়েন। সরোজিনি ধাত্রী এসে চুলো থেকে মাটির হাঁড়িতে আংড়া তুলে পেটে আলতো করে বোলান। নানিকে আজকাল আর সরোজিনি ধাত্রীর বলতে হয় না সহ্য করেন মাসি। নানি নিজেই সহ্য করেন। দাঁতে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকেন পাটিতে। ষোল বাচ্চার জন্ম দিয়ে বাচ্চা হওয়া তাঁর কাছে এখন ডাল ভাত। ডাল ভাত হলেও এই বয়সে বিয়োতে তাঁর আর ভাল লাগে না। নাতি নাতনি বড় হচ্ছে, সংসার লোক বাড়ছে কচুরিপানার মত। এ সময়, সধবা কন্যারা পোঁয়াতি হবে, ছেলের বউ পোয়াতি হবে, তা না, নিজে ফি বছর আঁতুড় ঘরে ঢুকছেন। সরোজিনি ধাত্রী মা’কে বলেন, আগুনের তাপটা লাগলে বেদনা কমে, বাইচ্চা নিচের দিকে নামে। আরও একটু সহ্য কর ঈদুন। এইতো হইয়া গেল।
বাবা বাড়ি ফিরে চামড়ার বাক্স খুলে ছুরি কাঁচি বের করেন। বাবার হাতেই মা’র দুটো ছেলে হয়েছে। এবার মেয়ে হবে, বাবা মেয়ে চেয়েছেন। সরোজিনি ধাত্রী হাত গুটিয়ে বসে থাকেন মা’র শিথানের কাছে। বাবা হাত ঢুকিয়ে দেন মা’র দু’উরু ফাঁক করে, ভেতরে। কলকল করে বেরিয়ে আসে ঘোলা পানি। সরোজিনি বলেন, এই তো জল ভাঙছে, আর দেরি নাই।
বাবা হাত ঠেলেন আরও ভেতরে, একেবারে থলের ভেতর। ঘাম জমে কপালে তাঁর। হাত কাঁপে। কাঁপা হাত বের করে কুয়োর পাড়ে যান। বালতি টেনে পানি তোলেন। হাত ধুয়ে ফেলেন পানিতে। নানি তাজ্জব, রজব আলী হাত ধোয় কেন অসময়ে।
বাবা বলেন, আম্মা, ঈদুনরে হাসপাতালে নিতে অইব। বাচ্চা বাড়িতে হইব না। নানি স্বর চেপে বলেন, এ কি কন! দুই বাচ্চা হইল বাড়িতে!
এই বাচ্চা পেটের মধ্যে উল্টা হইয়া বসা। অপারেশন ছাড়া বাচ্চা হওয়ানো সম্ভব না। হাসপাতালে না নিলে বিপদ। শার্টের হাতায় কপালের ঘাম বাবা মুছে বলেন।
পানি ভাঙার পর গলা কাটা গরুর মত চেঁচান মা, বাড়ির লোক জাগছে, পড়শি জাগছে, নানির তিন মাস বয়সী ছেলে ফেলু জাগছে।
কুয়োর পাড় থেকে আঁতুড় ঘরে ফিরে বাবা দেখেন পা একখানা বেরিয়ে এসেছে আগন্তুকের। হাসপাতালে নিতে নিতে যদি বাচ্চা পথেই মইরা যায়! সরোজিনি ধাত্রী বলেন, কপালে ভাঁজ ফেলে। শুনে বাবার কপালেও ভাঁজ পড়ে, সংক্রামক ভাঁজ। কালো বিচ্ছু ভুরুদুটো গায়ে গায়ে রেগে থাকে যমজ ভাইএর মত। কানে নল লাগিয়ে বাচ্চার হৃদপিন্ডের শব্দ শোনেন লাব ডা…ব লা..ব ডাব লা–ব ডা–ব লাব ডা—-ব লা—-ব ডাব লা——ব ডা——। ভিজে পিঠের সঙ্গে রেগে থাকে পরনের শাদা শার্ট। এনাটমির ডাক্তার তিনি, লিটন মেডিকেল ইস্কুলে হাড়গোড় পড়ান ছাত্রদের, লাশ কাটা ঘরে মরা মানুষ কেটে মাংসের শিরার-ধমনির- স্নায়ুর পথঘাট চেনান। ফরামালিনে ডুবিয়ে রাখা হৃদপিন্ড, যকৃত, জরায়ু ট্রেতে করে এনে যেন চা বিস্কুট, শেখান নাড়িনক্ষত্র। প্রসূতি আর ধাত্রীবিদ্যায় বাবা দক্ষ নন তেমন। কিন্তু ঝুঁকি তাঁকে নিতেই হবে, হাল ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নন তিনি। আবার ঢুকিয়ে দেন হাত, থরথর দ্বিধার আঙুল, ভেতর থেকে হাঁটু মোড়া পা খানি বের করে আনেন। দুটো পা ঝুলে থাকে বাইরে। এই আঁতুড় ঘরে, যেখানে একটি ছোট কাঁচি, দুটো ছুরি আর কিছু সুঁই সুতো ছাড়া অন্য কোনও যন্ত্র নেই, কি করে সম্ভব প্রসব করানো! বাবা তাঁর ঘামে ভেজা শার্ট খুলে রেখে উদ্বিগ্ন তাকিয়ে থাকেন বেরিয়ে থাকা পা দুটোর দিকে, আর মা’র ত্রাহি চিৎকারের দিকে, সরোজিনির গুটিয়ে রাখা হাতের দিকে। গলায় যদি নাভির নল পেঁচিয়ে থাকে, বাবা ভাবেন, শ্বাস বন্ধ হয়ে মরবে আগন্তুক। তিনি নিজের হৃদপিন্ডের শব্দ শোনেন ঢিপঢিপ, আগন্তুকের হৃদপিন্ডের খবর নিতে তাঁর সাহস হয় না। সরোজিনি ধাত্রী মা’র শিথান থেকে সরে পৈথানে বসে বলেন, পা দুইটা ধইরা টান দেন ডাকতার সাব। টানাটানি করলে আবার কি না কি কান্ড ঘটে! বইয়ে পড়েছেন, বাচ্চা হয় মাথায় আঘাত খেয়ে, নয় গলায় নাভির ফাঁস লেগে মরে। ঝুঁকি না নিয়ে অপরাশেন কর, ফরসেপ নয় সিজারিয়ান। দ্রুত তিনি আঁতুড় ঘর খেকে বেরিয়ে নানিকে ডেকে বলেন–রিক্সা আনতে পাঠান কাউরে, হাসপাতালে নিতে হইব।
আবার ঘরে ফিরে তিনি অস্থির হাঁটেন। ঘামে ভিজে হাতকাটা গেঞ্জি সপসপ করছে। মাথায় তাঁর বই পড়া বিদ্যে, তিনি জানেন পা দুটো ধরে সামনে টানলে বেরিয়ে আসবে পিঠ। তাই করেন, পিঠ বেরোতে শুরু করে।
নিচের দিকে চাপ দেও। মুখ বন্ধ কইরা শরীলের সমস্ত শক্তি দিয়া চাপ দেও।
বাবা দাঁত খিঁচে মা’কে বলেন। এবার আগন্তুকের গলা আটকে শরীর ঝুলে থাকে নিচে।
সরোজিনি বলেন, মেয়ে হইছে। আপনে মেয়ে চাইছিলেন, পাইছেন।
কিন্তু মেয়ের চাঁদমুখখানা তো আর জগতের আলো দেখে না। ডাক্তারি বিদ্যার ভাল ছাত্রের মাথায় গিজগিজ করা বিদ্যে। এনাটমির নামি শিক্ষক ঘরের বউএর ওপর তাঁর বিদ্যে খাটান। আগন্তুকের বুকের ওপর নল চেপে বেঁচে আছে কি না পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখেন, এখনও বেঁচে। দু’হাত ঢুকিয়ে মেয়ের মাথার দু’দিকে, আঙুল ঘি তোলে যেমন, তেমন করে ঢিলে করে সরাতে থাকেন গলায় পেঁচানো নাভি। সরোজিনি ধাত্রী মাকে বলেন–ভগবানের নাম লও ঈদুন।
দরজার ওপাশ থেকে নানি বলেন–আল্লাহরে ডাক। আল্লাহরে ডাক ঈদুন।
মা চিৎকার জুড়ে দেন ও আল্লাহ ও আল্লাহ বলে।
শেষ অবদি জগতে অবতরণ করি বটে, শ্বাসকষ্টে ভুগে, যায় যায় হৃদপিন্ড নিয়ে। আমার চিৎকারের তলে মা’র ও আল্লাহ, ও আল্লাহ ডাক ম্লান হয়ে যায়। গামলায় কুসুম গরম জলে আমাকে ভেজান সরোজিনি, গা সাফ করেন।
আঁতুড় ঘর থেকে ছোঁ মেরে আমাকে নিয়ে যান রুনু খালা। রুনু খালার হাত থেকে ঝুনু খালা, ঝুনু খালার হাত থেকে বড় মামা, বড় মামা বলেন–এ তো দেখি আস্ত একটা রাজকন্যা। এই বাড়িতে রাজকন্যা হইছে।
তখন সুবেহ সাদিক, আকাশ ফর্সা হচ্ছে। উঠোনে খুশির ধুম পড়ে যায়। দু’ছেলের পর এক মেয়ে। রাজকন্যার মুখ দেখতে ভিড় করেন হাশেম মামা, টুটু মামা, শরাফ মামা। ফজলি খালা রাজকন্যার মুখ দেখার আগে আতুঁড় ঘরে ঢুকে বলেন–বড়বু, কী ভাল দিনে তোমার মেয়ে জন্মেছে গো! বারোই রবিউল আওয়াল, নবীজি এ দিনে জন্মেছিলেন। এ মেয়ে খুব পরহেজগার হবে। তোমার কপাল ভাল বড়বু।
সকালে খাঁচা ভরে মিষ্টি কিনে আনেন নানা, আশে পাশের বাড়ি থেকে দল বেঁধে লোক আসে রবিউল আওয়াল মাসের বারো তারিখে জন্মানো মেয়ে দেখতে, রাজকন্যা দেখতে।
বড় হয়ে মা’র মুখে গপ্প শুনতে চাইলে মা গপ্প কিচ্ছা না বলে প্রায়ই বলতেন তরে পেডো লইয়া কলপারে পিছলা খাইয়া পইড়া গেছিলাম। ভিতরে লইড়া গেছিলি, উল্টা হইছস। গোল টেবিলটার উপরে তরে শোয়াইয়া রাখছিল, এত বড় যে গোল টেবিল, তার অর্ধেক হইলি তুই। এরম বড় বাচ্চা আর কেউ দেখে নাই। মা কইত বাচ্চারে কাপড় চোপড়ে মুইড়া রাখ, কপালে নজর ফোঁটা দে। মাইনষের চোখ লাগব। দুই দিনের বাচ্চা দেইখা সোহেলির মা চোখ কপালে তুইলা কয়, কয় মাসের বাচ্চা এইটা? মনুর মা তর গুল মাথাডা দেইখ্যা কইল, বেলেরও ত এট্টু এবাডেবা আছে, এর কিচ্ছু নাই।
শুয়ে থাকা মা’র পেটের ওপর থুতনি রেখে বলেছিলাম–বাচ্চা কেমনে হয় মা?
মা শাড়ি সরিয়ে এঁটেল কাদার মত নরম পেট দেখিয়ে বলেছেন–এইখানটায়, তুমার বাবা, ডাকতার তো, ব্লেড দিয়া কাইটা বাচ্চা বার করছে।
তলপেটের শাদা দাগগুলো, একটি একটি করে দেখিয়ে বলেন, এইটা হইল নোমান হওয়ার, এইটা কামালের, এইটা তোমার আর এইটা ইয়াসমিনের।
করুণ চোখে তাকিয়ে থাকি শাদা দাগের দিকে। আলতো আঙুল বুলোই। মা’র জন্য বড় মায়া হয় আমার। বলি–ইস, রক্ত বার হয় নাই?
মা হেসে আমার চিবুকে টোকা দিয়ে বললেন–তা হইছে। পরে সেলাই কইরা দিলে আবার ভালা হইয়া গেছি।
খানিক পর আমাকে টেনে বুকে শুইয়ে মা বললেন–আমি মইরা গেলে তুমি কানবা, মা?
আমি ডানে বাঁয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছিলাম–তুমি মরবা না। তুমি মইরা গেলে আমিও মইরা যাব।
মা তাঁর উল্টো-মেয়েকে কোলে নিয়ে