গার দ্য নর্দ থেকে গার দ্য অস্তারলিজ
ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছ না কেন?
বেরিয়ে যাব কোথায়?
আপাতত আমার বাড়িতে এসো। তারপর দেখা যাক।
.
এই তোমার চাবি, সব রইল, আমি কেবল আমার জিনিসপত্র নিয়ে গেলাম। বাড়িঘর যেমন ছিল, আছে। বাড়ি ছাড়ার একটি কারণ, আমাদের মিলছে না, এ কথা কিষান তুমিও ভাল জানো। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে জীবনযাপন যে সহজ নয়, সে আমি জানি। চাকরি নেবার পরই তোমার অন্য রূপ দেখতে পাচ্ছি, তুমি আমাকে প্রতিটি মুহূর্তে অসম্মান করছ। কিন্তু একবারও ভেবে দেখতে চাওনি, ওই বাক্সবন্দির কাজ করে আমি কি খুব আনন্দ পাই, ও করব বলে কি লেখাপড়া করেছিলাম। আমি যে কারণে ও কাজটি নিয়েছি, তা হল, তোমার কাছে ভিক্ষে চাইতে আমার ভাল লাগে না। জানি, তুমি একে ভিক্ষে মনে করো না, তুমি মনে করো, তুমি তোমার স্ত্রীর ভরণ পোষণ করছ, দায়িত্ব পালন করছ, এ করলে খুব স্বাভাবিক ভাবেই তুমি বিনিময় দাবি করা, বিনিময়টি হচ্ছে, তোমার আদেশ মতো আমাকে প্রতিটি কাজ করতে হবে, তুমি ডানে যেতে বললে আমাকে ডানে যেতে হবে, বামে বললে বামে যেতে হবে, কারণ তুমি কর্তা, তুমি প্রভু, তুমি না হলে আমার জীবন চলবে না, আমি হলাম নেহাতই এক দাসী তোমার, তোমার ঘরদোর সামলে রাখার, রান্নাবান্না করার, পরিবেশন করার, আর রাতে বিছানায় তোমাকে যৌনানন্দ দেবার। এ ছাড়া আর কোনও ভূমিকায় আমাকে দেখো কি? অবশ্য দেখো, সেদিন বললে তোমার সন্তান দরকার। তোমাকে সন্তান দিতে হবে আমার। এ যেন আমার ব্যাপার নয়, কেবলই তোমার ব্যাপার। তুমি চাও বলে আমাকে দিতে হবে। এরকম তো হতে পারত যে আমরা চাইব।
সে রাতে আমার দুজন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করে আমি বুঝলাম, এ বাড়িতে কাউকে নিমন্ত্রণ করার আমার কোনও অধিকার নেই। সম্ভবত কোনও বন্ধু থাকার অধিকারও আমার নেই। মাছ মাংসের গন্ধ নিয়ে তোমার ঢং অনেক দেখেছি, সারাদিন রেস্তোরাঁয় ওই গন্ধের মধ্যে থেকে এসে বাড়িতে সে গন্ধ আর চাও না। কী কারণ, কারণ আমাকে যে করেই হোক নিরামিষাশী বানাবে তুমি। এতকাল ধরে গড়ে ওঠা আমি, আমার অভ্যেস, আমার ভাষা, আমার স্বভাব, আমার রুচি সব জলাঞ্জলি দিয়ে আমাকে তোমার মনোমতো হয়ে উঠতে হবে। আমি অন্যায় কিছু করিনি, সে তুমি জানো। আমার ওপর তোমার রাগের মূল কারণ, তোমার আদেশ আমি অমান্য করেছি। এত বাধা নিষেধের মধ্যে আমার পক্ষে বাঁচা সম্ভব নয়।
আমি এ বাড়ি থেকে গেলে আমিও বাঁচি, তুমিও বাঁচো।
অনিশ্চিতের পথে পা বাড়ালাম। আপাতত এক বান্ধবীর বাড়িতে।
আমার খোঁজ কোরো না।
নীলা।
.
চিঠিটি খাবার টেবিলের ওপর রেখে, তার ওপর চাবির গোছা, দানিয়েলের সঙ্গে নীলা বেরিয়ে এল পরদিন বিকেলে। গার দ্য নর্দ থেকে গার দ্য অস্তারলিজ। আগের রাতের এঁটো বাসনপত্র ওভাবেই রান্নাঘরে পড়েছিল। থাকুক, নীলা মনে মনে বলেছে।
গার দ্য অস্তারলিজের ঠিক পেছনের পাঁচতলা একটি বাড়ির সারি সারি চিলেকোঠার একটি কোঠায় থাকে দানিয়েল, এককালে বড়লোকের বাড়ির চাকরানিরা থাকত ও সবে। বড়লোকেরা থাকত নীচতলায় আর চাকরানিরা ঠিক ছাদের তলায়, ছোট একটি চৌকি আর ছোট একটি টেবিল রাখার জায়গা ধরে এমন সব কোঠা, সাকুল্যে আট বর্গমিটার জায়গা। স্নানঘর নেই, করিডোরের এক কোণে একটি শুধু মলমূত্র ত্যাগের ঘর। দেশ থেকে শ্রেণীভেদ দূর হল, প্রভু-ভৃত্যের আমল গেল, চিলেকোঠাগুলোও খালি হল। খালিই পড়ে ছিল, আজকাল ছাত্রছাত্রীরা, নয়তো অল্প রোজগার যাদের, ভাড়া নেয়। দানিয়েল আটশো ফ্রাঁ দেয় মাসে ঘরটির ভাড়া। গত দু বছর সে এই চিলেকোঠাটিতেই আছে। টাকা পয়সা খুব একটা নেই, মাঝে মধ্যে এদিক ওদিক ছোটখাটো কাজ করে, আর করে লেখাপড়া, মেয়েদের পত্রিকায় লেখে, লেখা বলতে বইয়ের আলোচনা, তাও আবার যে কোনও বইয়ের নয়, মেয়েদের লেখা বইয়ের। দানিয়েল কানাডার মেয়ে, ফরাসি ওরও ভাষা, ওর মা অবশ্য আইরিশ। উনিশ শতকে আলুর দুর্ভিক্ষের সময় দানিয়েলের দাদু দিদিমা জাহাজে করে আয়ারল্যান্ড ছেড়ে উত্তর আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন। দানিয়েলের বাবার যদিও কানাডায় জন্ম, ফরাসি আর আদি আমেরিকানের রক্ত শরীরে, ওর ঠাকুরদাই ছিলেন সম্ভবত আদি আমেরিকান, যদিও দানিয়েল তাঁকে দেখেনি কোনওদিন