তাহার উন্নত গৌরবর্ণ দেহে অসাধারণ শক্তি ছিল। গ্রামের মধ্যে পরোপকারী বলিয়া তাহার যেমন খ্যাতি ছিল,গোঁয়ার বলিয়া তেমনই একটা অখ্যাতিও ছিল।কিন্তু ছোট ভাই পীতাম্বর সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির লোক।সে খর্বকায় এবং কৃশ। মানুষ মরিয়াছে শুনিলেই তাহার সন্ধ্যার পর গা ছমছম করিত।দাদার মত অমন মূর্খও নয়,,গোঁয়ারতুমির ধার দিয়াও সে চলিত না।সকালবেলা ভাই খাইয়া দপ্তর বগলে করিয়া হুগলির আদালতের পশ্চিম দিকের একটা গাছতলায় গিয়া বসিত এবং সমস্ত দিন আর্জি লিখিয়া যা উপার্জন করিত,সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরিয়া সেগুলি বাক্সে বন্ধ করিয়া ফেলিত।রাত্রে ঘরের দরজা-জানালা স্বহস্তে বন্ধ করিত এবং স্ত্রীকে দিয়া পুনঃপুন পরিক্ষা করাইয়া লইয়া তবে ঘুমাইত।
আজ সকালে নীলাম্বর চন্তীমন্ডপের একধারে বসিয় তামাক খাইতেছিল, তাহার অনুঢ়া ভগনী হরিমতি নিঃশব্দে আসিয়া পিঠের কাছে হাটু গাড়িয়া বসিয়া, দাদার পিঠে মুখ লুকাইয়া কাঁদিতে লাগিল।নীলাম্বর হুঁকাটা দেওয়ালে ঠেস দিয়া রাখিয়া আন্দাজ করিয়া এক হাত তাহার বোনের মাথার ওপর রাখিয়া, সস্নেহে কহিল,সকালবেলায় কান্না কেন দিদি,?
হরিমতি মুখ রগড়াইয়া পিঠময় চোখের জল মাখাইয়া দিতে দিতে জানাইল যে বৌ গাল টিপিয়া দিয়াছে এবং কানী বলিয়া গাল দিয়াছে।
নীলাম্বর হাসিয়া বলিল তোমাকে কানী বলে?অমন দুটি চোখ থাকতে, যে কানী।কিন্তু গাল টিপে দেয় কেন?
হরিমতি কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল মিছিমিছি।
মিছিমিছি? আচ্ছা চল তো দেখি,,বলিয়া বোনের হাত ধরিয়া ভিতের আসিয়া ডাকিল,,,বিরাজবৌ?
বড়বূধুর নাম বিরাজ; তাহার নয় বছরের বিবাহ হইয়াছে বলিয়া তাহাকে সবাই বিরাজবৌ বলিয়া ডাকিত। এখানে তাহার উনিশ -কুড়ি বছর। শাশুরির মরনের পর থেকেই সে গৃহিণী। বিরাজ অসামান্য সুন্দরী। চার-পাঁচ বছর পূর্বে তাহার একটি পুত্র সন্তান জন্মাইয়া আতুরেই মরিয়াছে, সেই অবধি সে নিঃসন্তান
রান্না ঘরে কাজ করিতে ছিল।স্বামীর ডাকে বাহিরে আসিয়া ভাইবোনকে এক সঙ্গে দেখিয়া জ্বলিয়া উঠিয়া বলিল,পোড়ামুখী আবার নালিশ করতে গিয়া ছিলি?
নীলাম্বর কহিল কেন যাবে না? তুমি কানি বলিচ, সেটা তোমার মিছা কথা তবে তুমি গাল টিপিলে কেন?
বিরাজ কহিল অত বড় মেয়ে, ঘুম থেকে উঠে চোখেমুখে জল দেওয়া নেই,কাপড় ছাড়া নেই,গোয়ালে ঢুকে বাছুর খুলো দিয়ে হা করিয়া দাড়িয়ে দেখচে।আজ এক ফোটা দুধ পাওয়া গেলো না।ওকে তো মারা উচিত ছিল।
নীলাম্বর কহিল না।ঝিকে গয়লা-বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু তুমি দিদি, হঠাৎ বাছুর খুলে দিতে গেলে কেন?
এ কাজ টা তো তোমার নই।
হরিমতি দাদার পিছনে দাড়াইয়া আস্তে আস্তে বলিল,আমি মনে করিচি দুধ দোয়া হয়ে গেছে।
আর কোন দিন না মনে ক'রো! বলিয়া বিরাজ রান্নাঘরে ঢুকিতে যায়তেছিল,নীলাম্বর হাসিয়া বলিল,তুমিও একদিন ওর বয়সে মায়ের পাখি উড়িয়ে দিয়েছিলে।খাঁচার দোর খুলে দিয়া মনে করিছিলে,, খাঁচার পাখি উড়তে পারে না।
মনে পড়ে?বিরাজবৌ??
বিরাজ ফিরিয়া দাঁড়াইলো হাসিমুখে বলিল,,পড়ে কিন্তু ও বয়সে নই,,আর ও ছোট ছিলাম। বলিয়া কাজে চলে গেলো।
হরিমতি কহিল চল না দাদা বাগানে গিয়া দেখি আম পাকিল কিনা।
তাই চল দিদি।
যদু চাকর ভিতরে ঢুকিয়া বলিল,নারাণ ঠাকুর দা বসে আছেন।
নীলাম্বর একট অপ্রতিভ হইয়া মৃদুস্বরে বলিল, এর মধ্যেই এসে বসে আছেন?
রান্নাঘরের ভিতর হইতে বিরাজ এ কথা শুনিয়া পাইতে দ্রুতপদে বাহিরে আসিয়া চেঁচাইয়া বলিল,যেতে বলে দে খুড়োকে। স্বামীর প্রতি চাহিয়া বলিল,সকালবেলাতেই যদি-ও - সব খাবে ত আমি মাথা খুড়ে মরব।কি-সব হচ্ছে আজকাল!
নীলাম্বর জবাব দিল না,নিঃশব্দে ভগিনীর হাত ধরিয়া খিড়কির দ্বার দিয়া বাগানে চলিয়া গেল।
এই বাগানটির এক প্রান্ত দিয়া শীর্ণকায় সরস্বতী নদীর মৃদু স্রোতটুকু গঙ্গাযাত্রীর শ্বাসঃপ্রশ্বাসের মত বহিয়া যাইতেছিল।
সর্বাঙ্গ শৈবালের পরিপূর্ণ ;শুধু মাঝে মাঝে গ্রামবাসীরা জল আহরণর জন্য কূপ খনন করিয়া রাখিয়া গিয়াছে।
তাহারাই আশেপাশে শৈবালমুক্ত অগভীর তলদেশে বিভক্ত শুক্তিগুলি স্বচ্ছ জলের ভিতর দিয়া অসংখ্য মাণিক্যের মত অতীত দিনের বর্ষার খরস্রোতে স্থলিত হইয়া আসিয়া পড়িয়াছিল। এ বাড়ির বূধুরা প্রতি সন্ধ্যায় তাহারই একাংশে মৃতাত্নার উদ্দেশ্য দীপ জ্বালিয়া দিয়া যাইত।সে পাথরখানির একধারে আসিয়া নীলাম্বর ছোটবোনটির হাত ধরিয়া বসিল।নদীর অভয় তীরেই বড়বড় আমবাগান এবং বাঁশঝাড়,দুইএকটা, বহু প্রাচীন অশ্বত্থ বট,নদীর উপর পর্যন্ত ঝুকিয়া পড়িয়া শাখা মেলিয়া দিয়াছে। ইহাদের শাখায় কতকাল কত পাখি নিরুদ্বেগে বাসা বাঁধিয়াছে,কত শাবক বড় করিয়াছে,কত ফল খাইয়াছে, কত গান গাহিয়াছে, তাহারই ছায়ায় বসিয়া ভাইবোন ক্ষনকাল চুপ করিয়া রহিল।
হঠাৎ হরিমতি দাদার ক্রোড়ের কাছে আরও একটু সরিয় আসিয়া বলিল,আচ্ছা দাদা, বৌদি কেন তোমাকে বোষ্টমঠাকুর বলে ডাকে?
নীলাম্বরের গলায় তুলসির মালা দেখাইয়া হাসিয়া বলিল,, আমি বোষ্টম বলেই ডাকে।
হরিমতি অবিশ্বাস করিয়া বলিল,যাঃ- তুমি কেন বোষ্টম হবে? তারা ত ভিক্ষে করে। আচ্ছা ভিক্ষে কেন করে দাদা?
নেই বলেই করে।
হরিমতি মুখ পানে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কিছু নেই? বাগান নেই, তাদের পুকুর নেই,ধানের গোলা নেই,কিচ্ছু নেই।
নীলাম্বর সস্নেহে হাত দিয়া বোনটির মাথার চুলগুলি নাড়িয়া দিয়া বলিল, কিচ্ছু নেই দিদি,কিচ্ছু নেই-বোষ্টম হলে কিচ্ছুটি থাকতে নেই।
হরিমতি কহিল তাহলে তাদের কেউ কেন কিছু কিছু দেয় না।
নীলাম্বর, কহিল তোর দাদাই কি তাদের দিয়াছে রে।
কেন দাও না দাদা,আমাদের তো এতো আছে।
নীলাম্বর সহাস্যে বলিল,তবুও তোর দাদা দিতে পারে না।কিন্তু তুই যখন রাজার বউ হবি দিদি তখন দিস।
হরিমতি বালিকা হলেও কথাটায় লজ্জা পেয়েছে।দাদার বুকে মুখ লুকাইয় বলিল যাঃ!
নীলাম্বর দুহাত চাপিয়া তাহার মস্তক চুম্বন করিল। মা-বাপ মরা এ বোনটিকে সে কত ভালোবাসে তাহর সীমা ছিল না। তিন বছরের শিশুকে বড়বৌটার হাতে সপিয়া দিয়া তাহাদের বিধবা জননী সাত বৎসর পূর্বে স্বর্গারোহন করে।সেই দিন হইতে নীলাম্বর হইাকে মানুষ করিয়াছে।সমস্ত গ্রামের রোগীর সেবা করিয়াছে,মরা পোড়াইয়াছে,কীর্তন গাহিয়াছে।গাঁজা খাইয়াছে,কিন্তু জননীর শেষ আদেশ টুকু এক মুহূর্তের জন্য অবহেলা করে নাই।
এমনি করিয়া বুকে করিয়া মানুষ করিয়াছিল বলিয়াই হরিমতি মায়ের মত অসঙ্কোচে দাদার বুকে মুখ রাখিয়া চুপ করিয়া রহিল।